বাচ্চাদের জান্নাতের জন্য তৈরি করুন, জাহান্নামের আগুনের জন্য না। খোদায়ী ভালোবাসা ও দায়িত্বে তাদেরকে অভ্যস্ত করুন। আপনি বাচ্চাকে আইফোণ কিনে দিলেন, নাকি এডিডাসের জুতো, নাকি আড়ঙ্গের জামা, এগুলো কোন মেটার করবে না যদি না ওকে নামাজ, সময়ানুবর্তিতা, রোজা, পর্দা, ত্যাগতিতিক্ষা, জীবে প্রেম ও সেবা, ইত্যাদির শিক্ষা না দেন। আপনার বাচ্চারা কয়টা মুরগী আর কতটা দামী খাবার খায় মেটার করে না। মেটার করে ও মানসিকভাবে একজন ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠছে কিনা। ইসলামে ৭ বছর বয়স থেকে নামাজের জন্য বলতে বলা হয়েছে। ১০ বছর হলে নামাযের জন্য শাসন করতে বলা হয়েছে। এটা ছেলে ও মেয়ে উভয় ধরনের বাচ্চাদের জন্য। কিন্তু ঠিক কখন নামাজ ফরজ হয়! যখন বাচ্চারা বালেগ হয়, অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক হয়। ইসলামে প্রাপ্ত বয়স্ক হবার বয়স ১৮ নয়, বরং যখন স্বপ্নদোষ বা মাসিক হয় তখনই ইসলামে সাধারনভাবে বালেগ গন্য করা হয়। এসময় থেকেই বাচ্চাদের আমলনামা শুরু হয়ে যায়, নিজ নিজ কর্মকান্ডের জন্য আল্লাহর কাছে নিজে নিজে জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এই প্রস্তুতি আমরা বাবা-মায়েরা নিয়ে দিতে হয়। এটাই বাবা-মায়ের দায়িত্ব। নামাজেরতো বয়স পাওয়া গেলো, ৭ বছর থেকেই বলা শুরু করতে হবে। কিন্তু পর্দার কি হবে, রোজার কি হবে! অনেক আলেমরা নামাজের সাথে মিলিয়ে ৭ বছর থেকে বাচ্চাদেরকে রোজা ও পর্দার ব্যাপারেও বলতে বলেন। ১০ বছর থেকে তাদেরকে এগুলোর জন্য শাসন করতে পারেন। তাহলেই তারা ১২-১৫ বছরে যখন বালেগ হয়ে উঠবে, তারা ইতিমধ্যে খোদায়ী ভালোবাসা ও দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে, ইনশাল্লাহ। অনেক বাবা-মাকে দেখি নামাজ পড়েন। কিন্তু বাচ্চাকে বলেন না। মনে করেন, বাচ্চা ছোট! বাচ্চার বয়স যখন ৭ পার হচ্ছে, এসময়ে তাকে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করাটাই আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। বাচ্চা ছোট টাইপের এক্সিউজ তৈরি করা না। এসময়ে চাপ দিতে বলা হয়নি, বলা হয়েছে ধীরে ধীরে শুরু করাতে। সো, নো হার্ড ফিলিংস। কিন্তু দ্বীনের এই হিকমাহকে পাস কাটিয়ে আপনি ফিলসফি কপচালে কাজ হবে না। আর যারা নিজেরা বাবা-মা হয়ে গিয়েছেন, এখনো নামাজ পড়া নিয়মিত হয়নি, তারা এই ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে পারেন। একই কথা রোজার জন্য। নামাজ-রোজা নিয়ে বাবা-মা হওয়ার পরও কারো গাফলতি থাকলে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এটাই বাস্তবতা যে, ঐ বাবা-মাকে তাদের বাবা-মায়েরা দ্বীনের সঠিক শিক্ষা দেননি। এখন ঐ বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দিতে প্রস্তুত না ধরনের অবস্থা। এই দুষ্টচক্র ভেঙ্গে দিতে পারেন বাবা-মায়েরা নিজেরা কিছুটা সচেতন হয়ে। অনেক মায়েরা নিজেরা হিজাব করেন, কিন্তু মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে দেখেও তাকে হিজাবের কথা বলেন না। তো আপনার মেয়ে হিজাবের কথা কোথা থেকে শিখবে। ঐ পরিবারের বাবাও হয়তো মেয়েটা বলেন না হিজাবের কথা। বাবা আর মায়েদের বলার ধরন ভিন্ন ভিন্ন। বাবা-মা দুজনে মিলে যদি বাচ্চা মেয়েটাকে ৭-৮ বছর থেকে পর্দার কথা না বলেন, তাহলে আপনাদের মাথার হিজাবটার পয়েন্ট কি! আপনি যদি খোদাভীতি জন্য হিজাবকে দ্বীনের বিধান হিসেবে জেনে পালন করেন, তাহলে নিজের কন্যাকে তা শিক্ষা না দেয়ার কি কারন থাকতে পারে? যদি মনে হয় মেয়েটা ছোট, এমন মনে হওয়াটা বুঝার জন্যেই মুলত এই পোষ্ট। ৭-৮ বছরের পর আপনার মেয়েকে এগুলো শিক্ষা দেয়ার বয়স শুরু হয়ে গিয়েছে, ও আর অতোটা ছোট নেই। যেরকম, নামাজের ব্যাপারে বলা শুরু করতে হয় ছেলে-মেয়ে সব বাচ্চাদের, একইভাবে হিসাব নিয়ে বলা শুরু করতে হবে মেয়ে বাচ্চাদের। মাঝে মাঝে পরিয়ে তাকে অভ্যস্ত করতে হবে। তার সাথে প্ল্যান করতে হবে কিভাবে তাকে ৮-১০ বছর বয়স থেকেই স্কুলে হিজাব পরে পারবে আখিরাতে পুরষ্কার পাওয়ার জন্য, এমন কথা বার্তা শুরু করতে হবে। পর্দা যে শুধু একটুকরো কাপড় না, বরং এটা মুসলিম নারীত্বের সিম্বল এমনটা বুঝিয়ে দিতে হবে। এখন মা-বাবা যদি নিজেরাই পাল্লা দিয়ে ৮-১০ বছর পার হবার পরো মেয়ে খোলামেলা চলতে বলেন, বাইরের গরম দেখলে তাকে গেঞ্জি পরিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেন, বাইরে বের হতে চুল খুলে হাওয়ায় ওড়াতে বলেন, এরপর আশা করেন যে সে একজন পর্দানশীল ধর্মানুরাগী মেয়ে হবে আপনার শিক্ষায়, এমনটা ভুল ধারনা। আল্লাহ তাকে কখনো হেদায়াত দিতে পারেন, কিন্তু সেটা আপনার শিক্ষায় হবে না। এক্ষেত্রে ধার্মিক বাবা-মা হিসেবে আল্লাহর বিচারের মানদন্ডে আপনারা দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। এবার কথা হলো পর্দা কি কেবল মেয়েদের জন্য! না ৭-৮ বছর বয়স থেকেই ছেলেদেরও বলা শুরু করা লাগবে কিভাবে মেয়ে দেখলে দৃষ্টি অবনমিত করতে হবে। কিভাবে মেয়েদেরকে মা-বোন হিসেবে রেসপেক্ট করতে হবে, কিভাবে নিজেকে উপযুক্ত দায়িত্বশীল পুরুষ হিসেবে গঠন করে একটি মেয়েকে জীবনসঙ্গী হিসেবে নিয়ে সংসার গড়তে হবে। ছেলে-মেয়ে উভয়কে পর্দা ও নারী-পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যগুলোকে সুন্দরভাবে তুলে ধরে নিজ নিজ রোলের জন্য তাদেরকে তৈরি করাটা ধার্মিকতারই পার্ট। আপনি মেয়ে পর্দা না করিয়ে কয়টা এলসার ড্রেস কিনে দিলেন, ছেলেকে নারীদের কিভাবে ডিল করতে হয় তা না বলে কয়টা প্লেস্টেশন কিনে দিলেন, এটা মেটার করে না। এটা খুব অদুভ লাগে যে, মা হিজাব করেন, আর তরুনী মেয়ে চুল ছেড়ে দিয়ে, হাই-মেকাপ নিয়ে, গরম লাগছে বলে একসাথে রাস্তায় হেটে বেড়ায়, মার্কেটে যায়। বরং পর্দার বিধান যদি বুঝে থাকেন তাহলে, মা হিসেবে আপনার পর্দা কিছুটা শিথিল হতে পারে, কিন্তু তরুনী হিসেবে আপনার মেয়ের পর্দা বরং মজবুত হওয়া দরকার। এগুলোতো গেলো বাধ্যতামুলক ব্যাপার-স্যাপার। এগুলোর পাশাপাশি বাচ্চাদের সালাম দেয়া, নিজেরা বাসায় একে অপরকে সালাম দেয়া, মসজিদে-গরিবদের বা ভালো কাজগুলোতে দান খয়রাত, মেহমানদারী, প্রতিবেশীর হক, ছেলেদের দাঁড়ি রাখা, মেয়েদের স্বর নিচু রাখা, ইত্যাদি নিয়েও শেখানো দরকার। পাশাপাশি ছেলে বাচ্চাদের লিডারশিপ, নিজেকে নিয়ন্ত্রন, পুরুষালী ব্যক্তিত্ব ও মজবুত দায়িত্বনুভুতির শিক্ষা দেয়া দরকার। মেয়ে বাচ্চাদের সংসার, সন্তান, গঠনমুলক ক্রিয়েটিভিটি, শুকরিয়ার অনুভুতি, নারীসুলভ কোমলতার শিক্ষা দেয়া দরকার। আশেপাশের মানুষদের যখন দেখেন সামান্য সামাজিকতাও বুঝতে পারে না, কাওকে রেসপেক্ট করে না, বা আজেবাজে কাজে লিপ্ত থাকে, এগুলো মুলত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের বাবা-মায়েরা তাদের যেভাবে গড়ে তুলেছে সেটারই প্রতিফলন। তাই আপনি যেন ব্যর্থ বাবা-মা না হোন তা নিয়ে ভাবা দরকার। অনেক বাবা-মা বিদেশে আসা নিয়ে হা-হুতাশ করেন। মুসলিম দেশে চলে যাবেন, খ্রিস্টান দেশে থাকা হারাম নাকি হালাল, সমাজ ও রাজনীতি এটা সেটা নিয়ে প্রচুর বাহাস করেন। নিজের সন্তানকে মসজিদমুখী না করে, নামাজ, পর্দা, রোজা এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষা না দিয়ে কাফিরদের বাচ্চাদের মতো পাল্লা দিয়ে খোলামেলা চলায় অভ্যস্ত করে আপনি কখন কেয়ামত চলে আসবে, কেন মুশরিকদের দেশে থাকা হারাম এসব ফতোয়া খুজবেন! লাভ হবে না। সন্তানকে শেখাতে না চাইলে আপনার-আমার সন্তানরা মক্কায় বড় হলেও একজন ফাসিক হয়ে উঠার সম্ভাবনা বেশী। তাই বেদ্বীনের দেশ বেদ্বীনের দেশ না করে, বরং যখন নামাজ, রোজা ও পর্দা শেখানোর সময় হয় তখন তা শেখানো শুরু করুন। নিজেও পালন করার চেষ্টা করুন। লেখা শেষ করার আগে বলবো, বাবা-মা হবার শত শত দায়িত্ব আছে। সবগুলোই আমরা চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু সফলতার মালিক উপর ওয়ালা। আপনি সর্বোচ্চ সঠিকভাবে চেষ্টা করলেন, বাচ্চা তা শিখলো না, এটার দায় আপনার না। কিন্তু আপনার চেষ্টার ঘাটতির কারনে আপনার বাচ্চা অধার্মিক বা অসামাজিক হয়ে উঠলো, এটার দায় নিতে হবে। কিন্তু সর্বোপরি, একে অপরকে দায় দেয়াটা মুল লক্ষ্য না এই লেখার। লেখাটা পড়ে আপনারা কিছুটা হলেও বিষয়গুলো ভাববেন এবং নিজেদের উপযোগী করে কাজে লাগাবেন এটাই চাই। লেখক হিসেবে আমি নিজেও যে শতভাগ সফল এটা বলবো না, বরং আমিও একই চেষ্টাই করি যাতে সন্তানরা কিছু শিখতে পারে। আসুন সবাই চেষ্টা চালিয়ে যাই যাতে আমাদের সন্তানরা আমাদের চেয়েও ভালো মুসলিম হয়ে গড়ে ওঠে। ফি আমানিল্লাহ।