যুদ্ধ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা War Economy বা যুদ্ধভিত্তিক অর্থনীতি, হ্যাঁ এই টার্মটা গত শত বছরের পৃথিবীর ব্যবস্থাপনার মুলভিত্তি। বিগত দুই শতাব্দী ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে একটি অলিখিত এবং নিষ্ঠুর বৈশ্বিক নীতি, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলেন ‘ফরএভার ওয়ার মডেল’ (Forever War Model) বা চিরস্থায়ী যুদ্ধ নীতি। ১৮১৫ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মডেলের ওপর ভর করেই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। যেখানে যুদ্ধ মানেই অস্ত্রের চাহিদা, ধ্বংস মানেই পুনর্নির্মাণের ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে এসে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মহাকাব্যিক পরিবর্তন বা ‘দ্য গ্রেট ট্রানজিশন’ দৃশ্যমান হচ্ছে। রক্তের খনি আর অস্ত্রের ব্যবসা ছেড়ে বিশ্ব এখন প্রবেশ করছে ডেটা, চিপ এবং অ্যালগরিদমের যুগে। সহজ কথায়, বিশ্ব অর্থনীতি ‘যুদ্ধ মডেল’ থেকে ‘এআই (AI) মডেলে’ রূপান্তরিত হচ্ছে। কেন যুদ্ধ মডেলের অবসান ঘটছে? চিরস্থায়ী যুদ্ধ নীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতার ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। কিন্তু প্রযুক্তির বর্তমান যুগে এসে বিশ্বকে চালনা করতে চাইছে ‘বিগ টেক’ বা প্রযুক্তি খাত। আপনি যদি একটি ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক এআই গ্রিড (AI Grid), রোবোটিক্স নেটওয়ার্ক এবং সুপারকম্পিউটার ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে চান, তবে আপনার এমন একটি পৃথিবী লাগবে যা সবসময় যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে না। এআই এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদনের সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) সচল রাখতে, লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথগুলো উন্মুক্ত ও শান্ত রাখা জরুরি। ফলে, যে পুঁজিপতিরা এতদিন যুদ্ধের পেছনে বিনিয়োগ করে মুনাফা লুটত, তারা এখন বুঝতে পারছে যে যুদ্ধের চেয়ে ‘ডিজিটাল কন্ট্রোল গ্রিড’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো তৈরি করা অনেক বেশি লাভজনক। তিন শক্তির অদৃশ্য গৃহযুদ্ধ: FIC, MIC এবং TIC অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা বিশ্ব মূলত তিনটি অদৃশ্য শক্তি বা ‘কমপ্লেক্স’ দ্বারা পরিচালিত হয়: ১. FIC (Financial Industrial Complex): ওয়াল স্ট্রিট, বৈশ্বিক ব্যাংক এবং ব্ল্যাকরক বা ভ্যানগার্ডের মতো দানবীয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। ২. MIC (Military Industrial Complex): পেন্টাগনের বাজেট, অস্ত্র নির্মাতা লবিস্ট এবং যুদ্ধভিত্তিক অর্থনীতি। ৩. TIC (Technological Industrial Complex): সিলিকন ভ্যালি, ইলন মাস্ক, পিটার থিল এবং এআই-বিগ ডেটা ইন্ডাস্ট্রি। বিগত কয়েক দশক ধরে ফিন্যান্সিয়াল কমপ্লেক্স (FIC) এবং মিলিটারি কমপ্লেক্স (MIC) একসাথে কাজ করেছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের মতো অঞ্চলে ইসরায়েলের মতো ‘প্রক্সি’ ব্যবহার করে অস্থিরতা বজায় রাখত, যাতে অস্ত্রের ব্যবসা সচল থাকে। কিন্তু বর্তমানে টেকনোলজিক্যাল কমপ্লেক্স (TIC) বা বিগ টেক খাতের উত্থান এই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এখন ক্ষমতার শীর্ষে থাকা পুঁজিপতিদের মধ্যে এক অদৃশ্য গৃহযুদ্ধ চলছে—একপক্ষ চায় যুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা (MIC), অন্যপক্ষ চায় স্থায়িত্ব ও এআই বিপ্লব (TIC)। এই খেলায় এখন এআই বা টেকনোলজি খাতই জয়ী হতে যাচ্ছে। ভূ-রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া এই রূপান্তরের কারণেই বিশ্ব রাজনীতিতে অদ্ভুত সব পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের যে মূলধারার গণমাধ্যম বা রাজনীতিবিদরা অতীতে ইসরায়েলের যেকোনো পদক্ষেপের অন্ধ সমর্থন করত, তারা এখন প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সমালোচনা করছে। এটি কোনো মানবিক কারণে নয়, বরং এটি হলো যুদ্ধ মডেল থেকে বের হয়ে আসার একটি পূর্বপরিকল্পিত ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ (Exit Strategy)। এমনকি আমেরিকার বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটে জেডি ভ্যান্সের মতো কট্টর সিলিকন ভ্যালি-ঘনিষ্ঠ নেতাদের উত্থান প্রমাণ করে যে, আমেরিকার ভবিষ্যৎ শাসকরা এখন পুরোপুরি টেক-ইন্ডাস্ট্রির নিয়ন্ত্রণে। 'ওয়ার এজ এ সার্ভিস' থেকে 'ইনফ্রাস্ট্রাকচার এজ এ সার্ভিস' ভবিষ্যতের বিশ্ব আর বোমা মেরে কোনো দেশকে ধ্বংস করতে আগ্রহী নয়। কারণ কাউকে একবারই বোমা মারা যায়, কিন্তু যদি আপনি তার পুনর্নির্মাণের অর্থায়ন করেন, তবে আপনি তার বন্দর, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং পেমেন্ট গেটওয়েগুলো আগামী ৩০ বছরের জন্য নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন। বিশ্ব এখন ‘যুদ্ধ’ বিক্রি করা বন্ধ করে ‘অবকাঠামো ও এআই’ (Infrastructure and AI as a service) বিক্রি করার মডেলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর সার্বভৌম তহবিল (Sovereign Wealth Funds) এবং সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি যৌথভাবে এখন এমন এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা (New World Order) তৈরি করছে, যেখানে কামানের গোলার চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা হবে অনেক বেশি শক্তিশালী। বিস্তারিত দেখুন ভিডিওতে (ইংরেজী)।