সেনা অভ্যুত্থানে মিয়ানমারে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ-মিয়ানমার ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হচ্ছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রের আশঙ্কা, সোমবার মিয়ানমারে সেনা সরকার আসার পর দেশটিতে যেভাবে পুরো প্রশাসন ঢেলে সাজানো হচ্ছে, তাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিতে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে। এমনকি রাখাইনে আবারও ২০১৭ সালের মতো সেনা অভিযান হতে পারে এবং আরও এক দফা রোহিঙ্গা দল বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, যদি রোহিঙ্গারা আবারও দলবেঁধে আসে, তাহলে তাদের আর বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। তবে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে চীন আবারও মিয়ানমারের পক্ষ নিলেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ চীনের ওপর আস্থা রাখছে বলেও জানান তিনি। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ঘটনা মিয়ানমারের সামরিক সরকারের আমলেই হয়েছিল। আর অং সান সু চির ক্ষমতায় থাকার সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের কোনো ভূমিকাই দেখা যায়নি। ফলে এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে যেসব দেশ মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয় তার ওপরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করবে। মিয়ানমার পরিস্থিতি ও বৈঠক :গতকাল বুধবার দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, ৪ ফেব্রুয়ারি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ওয়ার্কিং গ্রুপের যে বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল, তার জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা স্বাভাবিক নয়। ঢাকায় মিয়ানমার ও চীনের রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। বৈঠক হবে কিনা, এখনও বলা যাচ্ছে না। সন্ধ্যায় আবারও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমকালকে বলেন, তখন পর্যন্ত মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও জানান, তার দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিনি নিজেও স্বাভাবিক যোগাযোগ করতে পারছেন না। সব আদেশ ও নির্দেশনা সেনা হাইকমান্ডের অনুমোদন ছাড়া হচ্ছে না। বৈঠকের ব্যাপারে নেপিদোর একটি সূত্র জানায়, রাজধানীতে প্রায় দু'দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল বুধবার সকাল থেকে ইন্টারনেট ব্যবস্থা মোটামুটি স্বাভাবিক হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে ওটিটি কল ও মেসেজ পাঠানো যাচ্ছে। তবে অনেক ওয়েবসাইটে ঢোকা যাচ্ছে না। আর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ-মিয়ানমার ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হচ্ছে না, এটা প্রায় নিশ্চিত। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র দপ্তরসহ সব দপ্তরের কর্মকর্তা বদল হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে আলাপের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তরাও এখন কার্যত দায়িত্বে নেই। পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে হয়তো বৈঠকের নতুন তারিখ পাওয়া যেতে পারে এক বা দুই সপ্তাহ পরে। পশ্চিমা একটি কূটনৈতিক সূত্র মিয়ানমারে সরকারি প্রশাসনে ব্যাপক রদবদলের তথ্য পাওয়ার উল্লেখ করে জানায়, স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির প্রশাসনের প্রায় সব নির্দেশনা আপাতত স্থগিত করে শুধু মিয়ানমারের সেনা দপ্তরের ফরমান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বার্তা দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিটি কাজেই সেনা দপ্তরের অনুমোদনের জন্য কর্মকর্তাদের যোগাযোগ করতে হচ্ছে। সূত্র আরও জানায়, নেপিদোর স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইন্টারনেট ব্যবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পরই দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় তুলতে দেখা গেছে। বেশিরভাগ ব্যবহারকারী অং সান সু চির মুক্তি ও তাকে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তবে রাজপথ এখন পর্যন্ত নিস্তব্ধ, প্রায় জনশূন্য। তবুও আশা :জাতিসংঘের একজন মুখপাত্রকে উদ্ৃব্দত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ফলে রাখাইনে থাকা প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা আরও দুর্দশার কবলে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। বুধবার দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও সাংবাদিকদের জানান, একাধিক বন্ধুরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, আবারও রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের দলবেঁধে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার মতো পরিস্থিতি হতে পারে। তবে বাংলাদেশ স্পষ্ট করে জানাতে চায়, আবারও রোহিঙ্গারা এলে বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করবে না। তিনি বলেন, মিয়ানমারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ১৯৭৮ ও ১৯৮২ সালে মিয়ানমারে সামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়েই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয়েছিল। অতএব এই প্রক্রিয়া একবারে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল তা বলা যায় না। সমার্থক বক্তব্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, মিয়ানমারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার কিছু নেই। এর আগে দু'বার রোহিঙ্গাদের যখন মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছিল তখন সে দেশে সামরিক সরকারই ছিল। আরও বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত অং সান সু চির আমলেই রাখাইনে ২০১৭ সালে সেনা অভিযান এবং গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। পরবর্তী সময়ে তাদের দেশে ফেরত নেওয়ার ব্যাপারেও অং সান সু চির কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। কারণ তার ক্ষমতা সীমিত ছিল এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার অবস্থানের কোনো পার্থক্যও দৃশ্যমান হয়নি। বরং সু চি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে গিয়ে সেনাবাহিনীর বক্তব্যই দিয়ে এসেছেন। অতএব তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন বলেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আর কিছু হবে না, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তিনি আরও বলেন, বরং দেখার বিষয় হচ্ছে পশ্চিমা যে দেশগুলো মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছে, তাদের ভূমিকা কী হয়। কারণ এর আগে সেনা শাসনের সময় মিয়ানমারের ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা ছিল তা পরে তুলে নেওয়া হয়। রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যার পর রোহিঙ্গা সংকট ভয়াবহ মাত্রায় শুরু হলেও পশ্চিমা দেশগুলো কিন্তু মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। বরং কানাডা ছাড়া পশ্চিমা সব বড় দেশই মিয়ানমারে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য ক্রমাগত বাড়িয়েছে। যুক্তরাজ্য বড় বিনিয়োগ করেছে। এবার সেনা অভ্যুত্থানের পর তাদের অবস্থান এখন পর্যন্ত নিন্দার ভাষার মধ্যেই আছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নেয়, দূতাবাস বন্ধ করে দেয়, মিয়ানমারের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলোর এখন পর্যন্ত সেই ভূমিকা দেখা যায়নি। নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারে সেনা ক্ষমতা গ্রহণের নিন্দা প্রস্তাবে চীনের ভেটো দেওয়ারও এটাই কারণ। তাদের বড় অর্থনৈতিক কার্যক্রম মিয়ানমার ঘিরে। পশ্চিমা দেশগুলো ক্রমাগত মিয়ানমারকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিশ্বায়নের সঙ্গে যুক্ত করলে চীনও তার শক্তি সংহত করতে চাইবে। সেটাই হচ্ছে। এখন যদি পশ্চিমা দেশগুলো কঠোর অবস্থানে যায় তাহলে তার ইতিবাচক প্রভাব রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে। এ কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং সংকটের স্থায়ী সমাধান পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলোর ভূমিকার ওপরই নির্ভর করছে, এটাই জোর দিয়ে বলা যায়।